আনন্দমঠ হিন্দু জাতীয়তাবাদের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়। ব্রিটিশদের হটানোর জন্য এই জাতীয়তাবাদ মুসলমানদের সাথে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনেনি। বইটির প্রথম সংস্করণ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের লড়াই থেকে মুসলমানদের একেবারেই বাদ দেয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণে যদিও শত্রু গোরা, ব্রিটিশ ও সেনা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘নেড়ে’ ও ‘যবন’ হয়ে যায়। এই দুটো অবমাননাকর শব্দ দ্বারা বাংলার মুসলমানদেরকে বোঝানো হতো।
আত্মসত্তার অন্বেষণ রাজনীতি মুক্ত নয়, এবং ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রসঙ্গ উপেক্ষা করে আলোচনা সম্ভব নয়। সাইল মায়ারাম মনে করেন, তারপরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো আত্মসত্তার অন্বেষণ এবং আত্মপরিচয় নির্মাণের আকাক্সক্ষা উপেক্ষা করতে পাওে না।
সামরিকীকরণ বলতে সামরিক বাহিনীর ঐতিহ্যগত ভূমিকার বাইরে সামরিক মতাদর্শের প্রয়োগ করাকেও বোঝায়। এই বোঝাবুঝির আলোকে আমার মনে হয় ধর্ষণকারীকে গুলি করে হত্যা করাকে স্রেফ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বেআইনী কাজ হিসেবে বিশ্লেষণ করার সীমাবদ্ধতা থেকে বাংলাদেশী নারীবাদীদের বের হবার সময় হয়েছে। ধর্ষককে গুলি করে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বরং এটাই দেখাচ্ছে যে তারা যাচ্ছোতাই করার ক্ষমতা রাখে। এর ফলে আর যাই হোক ধর্ষণ সমস্যার সমাধান একেবারেই হচ্ছে না।
মাৎস্যন্যায়ই হচ্ছে রাজনীতি। ধর্ষণের রাজনীতি মোতাবেক নির্দিষ্ট ধর্ষককে আইনত ‘ধর্ষণ’ করে খোদ ধর্ষণ ব্যাপারটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়– বাঁচানো যায় বৈষম্য ও বলপ্রয়োগভিত্তিক তথাকথিত আইনের শাসনের অনন্ত প্রেমহীনতাকে। এ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ গেছে বৈষম্যহীন-বলপ্রয়োগহীন-বলাৎকারহীন মুক্ত প্রেমময় সমাজ পরিগঠনের দিকে। অ্যানার্কির দিকে।
সাংবাদিক কাজল ভাই, যার সাথে কারাগারে আমার অত্যন্ত হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তিনি এখনো কারাগারে বন্দী; নাভাল আর্কিটেক্ট মাহফুজ আজ সতের মাসের বেশী সময় ধরে একই আইনে কারাযাপন করছেন। অবিলম্বে এঁরাসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সকল বন্দীদের মুক্তি চাই। এই আইন বাতিল চাই। স্বৈরাচারী আইন প্রণয়নের উৎস ফ্যাসিবাদী ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন চাই।
প্রতিষ্ঠানগুলো চূর্ণ করে দেয়া হয়েছে, যার পরিণতি হচ্ছে দেশে ধর্ষনের হোতারা বুক চিতিয়ে চলতে পারেন, লুটেরার বুক চিতিয়ে চলতে পারেন, আপনার অধিকার যারা লুট করেছে তাঁরা ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে পারেন। বাকি সব চলবে আর ‘সামজিক আন্দোলনের’ মাধ্যমে ধর্ষনের মোকাবেলা করবেন এটা বলতেই পারেন, কিন্ত আপনিও জানেন এগুলো কথার কথা।
কিন্তু ঔপনিবেশিক স্মৃতির বিউপনিবেশায়নের পুরো ধারণার প্রতিও আমি আগ্রহী। এর দ্বারা আমি বিনির্মাণ (deconstruction) বোঝাচ্ছি। আমাদের বোঝা দরকার উপনিবেশিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেসকল ব্যবস্থা গিয়েছে, তা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আফ্রিকা বা এশিয়া যাই হোক না কেন, সবগুলোকেই মনের বিউপনিবেশায়নের মধ্য দিয়ে যাওয়া দরকার। এটা উপলদ্ধি করা খুব বেশি জরুরি যে, উপনিবেশিক ব্যবস্থা প্রায় সবাইকে বিভিন্ন উপায়ে আক্রান্ত করে।
বখতিয়ার আহমেদ সম্পাদকীয় মন্তব্য: নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদের এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে, দৈনিক যুগান্তরে। ২০১৪ সালে একটি ছোট ভূমিকাসমেত তিনি তার ফেসবুক নোটে...
তবে যাই হোক, বাইবেল হাজির করে ইতিহাসকে এভাবে মেটাফোরিকালি পাঠ করে বর্তমান বোঝার চেষ্টা করার একটা ঝামেলাও আছে। কারণ সর্বোপরি আমাদের তো কোনো মেসিয়ানিক উদ্ধারকারীও এইমুহূর্তে হাজির নাই এইখানে- যে কিনা আমাদেরকে এই উন্নয়নের ফ্যাসীবাদ থেকে প্রাণে বাঁচাবে! তবে আমাদের এই সময়ে ফারাও রাজার মত কেউ আছে কিনা সেটা নিশ্চিত নই!
বাংলাদেশ আজ এক দমবন্ধ অবস্থার মধ্যে। একটা অসুস্থ সমাজের অসুস্থতাগুলোরও একটা সাধারণ ভারসাম্য থাকে। অসুস্থতার সেই ভারসাম্য নিয়ে সেই সমাজটা ধুঁকে ধুঁকে হলেও একরকমভাবে চলতে থাকে। কিন্তু ইতিবাচকতার রাজনীতি আজ জন্মপ্রতিবন্ধী বাংলাদেশের সকল অসুস্থতার ভারসাম্যও ভেঙে ফেলেছে। এ এক অভাবনীয় কাল!